নার্সিং

নার্সিং কি?

নার্সিং স্বাস্থ্যসেবা খাতের এমন একটি পেশা যা সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত। এ পেশার মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিকভাবে কোন ব্যক্তির বা রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হয় যাতে তারা সর্বোত্তম স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মান অর্জন, বজায় রাখতে বা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

বর্তমানে যে কোনো দেশে একজন পেশাদার নার্স হিসেবে হাসপাতাল, ক্লিনিক বা কোনো প্রতিষ্ঠিত এনজিওতে যোগদান করতে হলে উক্ত দেশের বা অঞ্চলের নার্সিং পেশার সনদ গ্রহণ করতে হয়। সনদ প্রাপ্ত নার্সগণদের রেজিষ্ট্রেড নার্স বা নিবন্ধিত নার্স হিসেবে অভিহিত করা হয়। নার্সিং পেশায় নারী পুরুষ উভয়েই নার্স নামে পরিচিত।

নার্সিং এর প্রাচীন ইতিহাস:

"নার্স" শব্দটি মূলত ল্যাটিন শব্দ "নিউট্রিয়ার-nutrire" থেকে এসেছে, যার অর্থ স্তন্যপান করা, ১৬ শতকের পূর্বে স্তন্যদানকারীদের নার্স বোঝাতো; এরপর ১৬ শতকের শেষের দিকে নার্স দ্বারা এমন একজন ব্যক্তিকে বোঝানো হতো যিনি দুর্বলদের যত্ন নেন।

প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে "চরক সংহিতা" ভারতে রচিত হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছে যে," ভাল চিকিৎসা অনুশীলনের জন্য একজন রোগী, চিকিত্সক, নার্স এবং ওষুধের প্রয়োজন, সেই সাথে নার্সের জ্ঞানী হওয়া প্রয়োজন, ফর্মুলা অনুযায়ী ডোজ প্রস্তুত করার দক্ষতা থাকতে হবে এবং সবার প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন।" নার্স শব্দ ব্যাবহারের এটিই সর্ব প্রাচীন পুস্তগত তথ্য

বিশ্বের প্রথম নার্স হিসেবে পরিচিত রোমান খ্রিষ্টান নার্স "ফোবি"। ১৬৫-১৮০ খ্রিস্টাব্দের গুটিবসন্ত মহামারী এবং ২৫০ খ্রিস্টাব্দের হামের প্রাদুর্ভাবের সময় খ্রিস্ট ধর্মের যাজকরা ভক্তদের উৎসাহিত করেছিল অসুস্থদের যত্ন নেওয়ার জন্য। এতে সেবা করার জন্য প্রথমবারের মতো এক শ্রেণীর মানুষ সংঘবদ্ধ হন, যাদের নার্স বলে পরিচিত করি আমরা।

৩২৫ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্ম সরকারী ধর্মে পরিণত হয়, যার ফলে সেবা ব্যবস্থার প্রসার ঘটে এবং বিভিন্ন দেশে তারা সেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল তৈরি করেন। এভাবেই প্রাচীনকালে নার্সিং এর অগ্রগতি শুরু হয়।

আধুনিক নার্সিং এর শুরু: ইংরেজ নার্স ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এর মাধ্যমে। একারণে তাকে বিশ্বের প্রথম নার্স হিসেবে সম্মানিত করা হয়। তার মধ্যদিয়েই বিশ্ব শিখেছে, কিভাবে একজন ভালো নার্স হওয়া যায়? ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ক্রিমিয়ান যুদ্ধের পর পেশাদার নার্সিং এর ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি মানুষকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন নারীরা চিকিৎসা ক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি অনেক লেখা-লেখি করেন। ১৮৭০ সালের পরে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকাতে ব্যাপকভাবে তার নার্সিং শিক্ষা এবং পোশার কথা ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বের ১ম দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডে জাতীয় পর্যায়ে নার্সদেরকে নিবন্ধিত করা হয়। এলেন ডাফার্টি ছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রথম নিবন্ধিত নার্স (বিশ্বের প্রথম নিবন্ধিত নার্স)। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৯০২ সালে "এথেল গর্ডন ফেনবীক" ; যুক্তরাষ্ট্রে ১৯০৩ সালে "জোসেফিনে ধরাধাম বার্টন" রেজিস্ট্রেড নার্স হন।

বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষার ইতিহাস:

অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রথম নার্স ছিলেন "বাই কাশীবাঈ গানপাট" (বর্তমানে ভারতের প্রথম নার্স হিসেবে পরিচিত)। ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশ তথা পূর্ববঙ্গে ৩টি জুনিয়র নার্সিং স্কুল ছিল। ব্রিটিশদের থেকে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৬০ সালে উক্ত জুনিয়র নার্সিং স্কুল বন্ধ করে ২ টি সিনিয়র নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তৎকালিন পাকিস্তান সরকার। স্বাধীনতার পূর্বে বর্তমান নার্সিং কাউন্সিলের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান নার্সিং কাউন্সিল এবং পূর্ব পাকিস্তানের মোট রেজিস্ট্রেড নার্স ছিলেন ৬০০ জন। ১৯৭০ সালে প্রথমবারের মতো সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই সময় থেকেই দৃশ্যমান উন্নতি শুরু হয় এদেশে।

২০০৮ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে, থাইল্যান্ডের কারিগরি সহায়তায় নার্সিং ও মিডওয়াফারি শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ করার লক্ষ্যে নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়। নতুন এই কারিকুলাম অনুযায়ী এসএসসি’র পরিবর্তে এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াফারি (সকল বিভাগের জন্য উন্মুক্ত) এবং ৪ বছর মেয়াদি বিএসসি নার্সিং (শুধু বিজ্ঞান বিভাগে উত্তীর্ণদের) কোর্স চালু করা হয়। পরবর্তীতে ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্সও চালু হয়।

নার্সিং পেশার ভবিষ্যত:

বিশ্বব্যাপি নার্সের চাহিদা অন্যান্য পেশার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে বিগত সময়ে করণা সংকটকালে নার্সিং পেশার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায় এবং সর্বসাধারণ নার্সিং পেশার গুরুত্ব অনুধাবণ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নার্সিং পাশ কারার এবং নার্সিং লাইসেন্স পাবার ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যেই বেসরকারি পর্যায়ে চাকরি পেয়ে যান ৯৯% নার্স। এছাড়া সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে নার্সিং পেশাতে সবচেয়ে কম প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে ২০২২ সালে এবং ২০১৮ সালে বিপিএসসির নন ক্যাডার নার্স নিয়োগ পরীক্ষায় অনূত্তীর্ণ প্রার্থীরাও বিশেষ বিবেচনায় করণা সংকট মোকাবেলার জন্য নিয়োগ পান। এ থেকেই বুঝা যায় নার্সিং পেশায় অন্যান্য পেশার মত কঠিন প্রতিযোগিতা এখনো হয়নি। তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বিভিন্ন দেশে নার্স পাঠাচ্ছেন বোয়েলসের মাধ্যমে এবং বেসরকারি পর্য়ায়ে বিদেশে নার্স প্রেরণের কার্যক্রম চলছে, কেননা বিদেশে নার্সদের চাহিদা এবং বেতন অনেক বেশি।

Next Post Previous Post