ডিম খাওয়ার নিয়ম, উপকারিতা ও অপকারিতা

ডিম খাওয়ার উপকারিতা

ডিম উন্নতমানের আমিষজাতীয় খাদ্য। ডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি, প্রোটিন, ভিটামিন, বিভিন্ন ধরণের উপকারি ফ্যাট এবং অতি মূল্যবান ওমেগা-৩। ডিম সহজলভ্য এবং সুস্বাদু খাবার হওয়ায় ছোট-বড় সবার জন্য উত্তম খাবার হিসেবে পরিগণীত।

ডিম খাওয়ার উপকারিতা

ডিম খাওয়ার উপকার অনেক। নিয়মিত ডিম খেলে আপনি অনেক রোগ সারিয়ে তুলতে পারবেন সহজেই তাছাড়া মেধাশক্তি বৃদ্ধি, শারীরিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

  • ক্যালরি: শরীরে দ্রুত শক্তি বা ক্যালরি উৎপন্ন করতে পারে এমন খাবারগুলোর মধ্যে ডিম অন্যতম। ডিম খাওয়ার ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে শরীরে শক্তি বা এনার্জি উৎপন্ন করে।
  • ভিটামিন-এ: ডিমের ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তিকে উন্নত করে। তাছাড়া চোখে ছানিপড়ার সম্ভাবণা কমিয়ে দেয় অনেকাংশে।
  • লুটেইন ও যিয়াস্যানথিন নামক দুটি প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে ডিমে যা বৃদ্ধ বয়সে চোখের ক্ষতি ঠেকাতে সাহায্য করে।
  • ভিটামিন বি: ডিমের ভিটামিন বি পাকস্থলীর অন্য খাবারগুলোকে দ্রুত শক্তিতে রূপান্তরিত করে। তাই প্রতিদিন সকালে একটি সেদ্ধ খেলে সারাদিন ক্লান্তহীন থাকবেন।
  • ভিটামিন ডি: শরীরের বিভিন্ন পেশীর ব্যথা কমাতে এবং পেশী মজবুত করতে সাহায্য করে ডিমে থাকা ভিটামিন ডি।
  • ভিটামিন ই: ডিমে রয়েছে ভিটামিন ই, যা সরাসরি আমাদের ত্বকের মৃত কোষ ধংষ করতে এবং নতুন কোষ তৈরি হতেও সাহায্য করে থাকে।
  • ব্রেস্ট ক্যানসার বর্তমানে একটি দুষচিন্তার বিষয়। এই ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে ডিম।
  • প্রোটিন: নারী স্বাস্থ্যের উন্নতিতে জন্য প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রোটিন প্রয়োজন হয়, যা ডিম থেকে পাওয়া যায়। একটি ডিম থেকে ৬.৫ গ্রাম প্রোটিন মেলে।
  • একটি পরীক্ষায় প্রমাণ মেলে, ডিম খেলে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবণা কমে যায়, ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।
  • ওমেগা ৩: ডিমে থাকা ওমেগা ৩ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০% পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম।
  • নিয়মিত ডিম খেলে লোহিত রক্তকণিকা বাড়ে, এজন্য রক্ত্শল্পতায় ভোগা রোগিদের নিয়মিত ডিম খাওয়ালে ভাল ফল পাওয়া যায়।
  • কোলাইন: শরীরের সার্বিক সুস্থতায় কোলাইন খুবই প্রয়োজন। কোলাইনের ঘাটতি হলে লিভারের নানা সমস্যা বা নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার হয়। প্রতিটি ডিমে গড়ে ৩০০-৩৫০ মাইক্রোগ্রাম কোলাইন থাকে। এই কোলাইনের অভাবে লিভারের বিভিন্ন অসুখ দেখা দেয়। তাই ডিম খেলে লিভার ও স্নায়ু ভালো থাকে।
  • অ্যামাইনো অ্যাসিড: প্রোটিনের মূল উৎস হলো অ্যামিনো অ্যাসিড। প্রোটিন তৈরিতে প্রায় ২১ ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড লাগে। যার মধ্যে ৯টি শরীরে তৈরি হয় না। এজন্য বাইরে থেকে প্রোটিন গ্রহণ করতে হয়। যা মেলে ডিম থেকে।
  • সালফার: ডিমে রয়েছে সালফার। সালফারের অভাবে নখ ভেঙ্গে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়। তাই নিয়মিত ডিম খেলে হাত-পায়ের নখ হবে সুন্দর ও সাদা।
  • আয়রন: রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় নারী ও শিশুরা বেশি ভোগে। অ্যানিমিয়া হয় শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে। ডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। তাই নিয়মিত ডিম খেলে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া সমস্যার সমাধান সহজেই।
  • জিংক: ডিমে থাকা জিংক শরীরের ইমিউনিটি সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই শক্তিশালী করে। ঘন ঘন সর্দি-কাশি বা জ্বরে যারা ভুগের তারা খুব ভাল উপকার পাবেন নিয়মিত ডিম খেলে।
  • ফসফরাস: দাঁতে ও হাড়ের স্বাস্থ্য উন্নত করে ডিমের মধ্যে থাকা ফসফরাস। তাই দাঁত ও হাড় মজবুত রাখতে প্রতিদিন ডিম খান।

ডিম খাওয়ার অপকারিতা:

  • ব্রিটিশ ডায়েটিক অ্যাসোসিয়েশনের ড: ফ্র্যাঙ্কি ফিলিপস্ বলছেন, ''দিনে একটা - এমনকি দুটো ডিমও স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।'' তিনি বেশ কিছু গবেষণা থেকে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে সতর্কবাণী করেন - '' ডিম যদিও ''প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ একটা উৎস'', কিন্তু আমাদের অন্যান্য খাবার থেকেও আমরা প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন পাই - যা অনেক সময়ই শরীরের জন্য দৈনন্দিন প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি। কাজেই ''কিডনির জন্য চাপ সৃষ্টি হতে পারে অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করলে''।
  • প্রতিদিন ১টি বা ২টির বেশি নিয়মিত ডিম না খাওয়াই উত্তম, তবে অন্য কোনো প্রটিন সমৃদ্ধ খাবার না খেলে ডিম বেশি খেতে পারেন, এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই।
  • যারা উচ্চরক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, তারা ডিম খেলে রক্তচাপ আরো বাড়বে, তাদের ক্ষেত্রে ডিম না খাওয়াই ভাল।
  • ইউরিক অ্যাসিডের প্রবণতা থাকলে সমস্যা বাড়বে ডিম খেলে।
  • কোনোরকম ক্রনিক অসুখে যারা ভুগছেন তারা ডিম খেতে পারবেননা। তবে ডাক্তারের পরামর্শে বিশেষ ক্ষেত্রে খাওয়া যেতে পারে।

রাতে ডিম খাওয়ার উপকারিতা:

বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা ফলাফল থেকে জানা যায়, রাতে ডিম খেলে অনেকের স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো ঘুম হয়। এক্ষেত্রে যারা রাত জাগেন তারা রাতের খাবারের পরে এবং ঘুমানোর বেশ কিছুক্ষণ আগে হালকা নাস্তা হিসেবে সেদ্ধ ডিম বা ডিম-পোচ খেতে পারেন। তবে যদি আপনি কোনো সমস্যা অনুভব করেন তাহলে রাতে ডিম খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। গ্যাস্ট্রোসোফিজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (DERD) আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নিদ্রাহীনতার সমস্যা দেখা দিতে পারে ঘুমানোর আগে ডিম খেলে। ডিমের কুসুমের ফ্যাটযুক্ত উপাদান ঘুমে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে।

রাতে ঘুমানোর আগে ডিম খাওয়ার উপকারিতা:

সারাদিন কঠোর শারিরিক পরিশ্রমের কাজ করেন যারা তাদের জন্য রাতের ঘুম খুবি গুরত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে শরীরের ক্ষয়পূরণ সঠিকভাবে হতে সাহায্য করবে যদি রাতে ঘুমানোর আগে ডিম খান। এছাড়া সকালে ঘুম থেকে উঠেই যারা পরিশ্রমের কাজ করবেন তারাও ভাল ফল পাবেন ঘুমানোর পূর্বে ডিম খেলে। তবে যারা তেমন শারীরিক পরিশ্রম করেননা, তাদের ক্ষেত্রে ঘুমানোর পূর্বে ডিম খাওয়া উচিৎ হবেনা।

সিদ্ধ ডিম খাওয়ার উপকারিতা

চিকিৎসকদের মতে, ওমলেট, পোচের তুলনায় সিদ্ধ ডিমই বেশি উপকারি। পুরোপুরি সিদ্ধ ডিম ওজন কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিদ্ধ ডিম দুই সপ্তাহের মধ্যে ১১ কেজি পর্যন্ত ওজন কমাতে পারে। সিদ্ধ ডিমে ক্যালরি কম থাকায় শরীরে মেদ জমে না। তাছাড়া ব্লাড সুগার, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভাজা ডিমের তুলনায় সেদ্ধ ডিমে বেশি উপকার।

হাফ বয়েল ডিমে বেশি পুষ্টিগুন থাকে তবে ডিমের জিবাণু পুরোপুরি ধংষ করতে ফুল বয়েল বা সিদ্ধ করতে হয়। শিশুরা নিয়মিত সিদ্ধ ডিম খেলে দাঁত, হাড় শক্তিশালী হয়। গর্ভাবস্থায় মহিলারা নিয়মিত সিদ্ধ ডিম খেলে তাদের ও সন্তানের উপকার হয়। সিদ্ধ ডিম স্নায়ু ও হৃদযন্ত্র সচল রাখতে সাহায্য করে। এটা মস্তিষ্কের মেমব্রেন ও পেশি সুগঠিত রাখতে সাহায্য করে, যা মস্তিষ্কের ঝিল্লি গঠন করতে সহায়তা করে এবং এটা স্নায়ু থেকে পেশিতে সংবেদন পৌঁছাতে সহায়তা করে।

ভাজা ডিমের উপকারিতা:

সিদ্ধ ডিমের চেয়ে ভাজা ডিমে ক্যালরি বেশি থাকে। একটি সিদ্ধ ডিমে আপনি ৭৮ ক্যালরি পাবেন, অন্যদিকে ভাজা ডিমে পাবেন ৯০ ক্যালরি। তাছাড়া ডিম ভাজতে বা পোস করতে সিদ্ধ ডিমের তুলনায় অনেক কম সময় লাগে, আর স্বাদের দিক থেকেও অনেকের কাছে বেশি পছন্দের ভাজা ডিম।

ডিম খাওয়ার নিয়ম:

ডিম খাওয়ার সঠিক নিয়ম হলো সিদ্ধ করে খাওয়া। অনেকে কাচা ডিম খেয়ে থাকেন, কাঁচা ডিমে অনেক ব্যাকটেরিয়া থেকে থাকে যা আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর, অনুরূপ আধাসেদ্ধ ডিমেও পুরোপুরি ব্যাকটেরিয়া ধংষ হয়না তাই সর্বোত্তম উপায় হলো ফুল সেগ্ধ করে খাওয়া। বিশেষ করে সর্দি-কাশি রোগে যারা প্রায়ই ভুগে থাকেন তাদের জন্য কাঁচা বা আধাসেদ্ধ ডিম ক্ষতির কারণ হতে পারে।

একভাবে ডিম খাওয়াতে বিরক্ত হতে পারেন, অনেকে আবার সিদ্ধ ডিম খেতে পারেননা সেক্ষেত্রে ডিমের আমলেট, পোস বা সবজির সাথে খেতে পারেন। তবে চেষ্টা করবেন সিদ্ধ ডিম খেতে, তাহলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাবেন।

Next Post Previous Post